আজ - বুধবার, ২২ আগস্ট, ২০১৮ ইং | ৭ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

খালেদা জিয়ার ৫ বছরের কারাদ-

নিজস্ব প্রতিবেদক : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ৫ বছর ও তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানসহ অপর পাঁচ আসামির ১০ বছর করে কারাদ- দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে তাদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটায় ঢাকার বকশীবাজার কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত বিশেষ আদালতে বিশেষ জজ ৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এ রায় দেন। ৪০৯ ও ১০৯ ধারা মোতাবেক আসামিপক্ষের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এ রায় দেন। রায়ে খালেদা জিয়া বিনাশ্রম ও অন্য পাঁচ আসামি সশ্রম কারাদ- ভোগ করবেন বলে জানিয়েছে আদালত। বাকি চার আসামি হলেন-সাবেক মুখ্যসচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও জিয়াউর রহমানের ভাগনে মমিনুর রহমান। এর মধ্যে পলাতক আছেন তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান। গতকাল দুপুর ২টা ১১ মিনিটে বিচারক এজলাসে প্রবেশ করেন এবং রায় পড়া শুরু করেন। শুরুতে তিনি ৬৬২ পৃষ্ঠার রায়ের পুরোটা না পড়ে ১৮ মিনিট পড়েন।
এর আগে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, টিয়ারশেল নিক্ষেপ আর ধরপাকড়ের মধ্যে দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে বকশীবাজার কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে বিশেষ জজ আদালত-৫ এর এজলাসে উপস্থিত হন খালেদা জিয়া। সকাল পৌনে ৯টার দিকে এ মামলার অপর দুই আসামি ব্যবসায়ী সলিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদকে আদালতে আনা হয়। এরপর সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বিচারক ড. আখতারুজ্জামান বিশেষ আদালতে এসে পৌঁছান। খালেদা জিয়া সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে তাঁর গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ থেকে বের হন। খালেদা জিয়ার গাড়িবহর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মগবাজার এলাকায় এলে শত শত নেতাকর্মী সেখানে যুক্ত হন। এ সময় রাস্তার পাশেও অনেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে সেখানে যুক্ত হন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের ধাওয়া-ধাওয়া পাল্টা, সংঘর্ষ ও আটকের ঘটনা ঘটে। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিদেশ থেকে এতিমদের সহায়তার জন্য আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়।
ফৌজদারি দ-বিধির ৪০৯ ধারায় দুদক আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধমূলক অসদাচরণের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়া, তার ছেলে তারেক রহমানসহ মোট ছয় আসামির বিচার শুরু করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ বাসুদেব রায়।২৬১ কার্যদিবস শুনানির পর ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান গতকাল এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের  তখনকার উপ সহকারী পরিচালক  হারুন-অর রশিদ এ মামলার এজাহারে খালেদা জিয়াসহ মোট সাতজনকে আসামি করেন। অন্য ছয়জন হলেন- খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমান, জিয়াউর রহমানের বোনের ছেলে মমিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক , সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ ও সৈয়দ আহমেদ ওরফে সায়ীদ আহমেদ। ২০০৯ সালের ৫ অগাস্ট দুদক কর্মকর্তা আদালতে যে অভিযোগপত্র দেন, সেখান থেকে গিয়াস উদ্দিন ও সায়ীদ আহমেদের নাম বাদ দেওয়া হয়। অব্যাহতির কারণ হিসেবে বলা হয়, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ অনেক আগে থেকে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। অভিযোগে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমান পাওয়া যায়নি। আর সায়ীদ আহমেদ নামে কারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।  সাবেক সাংসদ কামাল জালিয়াতি করে ট্রাস্টের কাজে ওই দুই জনের নাম ব্যবহার করেছেন। এজাহারে বলা হয়, খালেদা জিয়া এতিম তহবিল নামে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় একটি হিসাব খোলেন। একটি বিদেশি সংস্থা ১৯৯১ সালের ৯ জুন ওই হিসাবে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে অনুদান হিসেবে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা দেয়। দুই বছর ওই টাকা কোনো এতিমখানায় না দিয়ে জমা রাখা হয়। এরপর জিয়া পরিবারের তারেক রহমান, তার ভাই আরাফাত রহমান এবং তাদের ফুপাতো ভাই মমিনুরকে দিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করে ওই টাকা তাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ করা হয়, ওই ট্রাস্ট গঠনে সরকারি নীতিমালা মানা হয়নি। এছাড়া ট্রাস্টের ঠিকানা হিসেবে খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের ৬ নম্বর মইনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।
পরে ওই টাকা দুইভাগে ভাগ করে ট্রাস্টের বগুড়া ও বাগেরহাট শাখার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫’শ টাকা ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে বরাদ্দ দেওয়া হয় বগুড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে। ওই অর্থ থেকে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ট্রাস্টের নামে বগুড়ার দাঁড়াইল মৌজায় ২.৭৯ একর জমি কেনা হয়। কিন্তু অবশিষ্ট টাকা এতিমখানায় ব্যয় না করে ব্যাংকে জমা রাখা হয়। ২০০৬ সনের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত তা সুদে আসলে বেড়ে ৩ কোটি, ৩৭ লাখ ৭ শ ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা হয়। এজাহারে আরো বলা হয়, ২০০৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা তার ছেলে তারেক রহমান ও মমিনুর রহমানকে দিয়ে তিন কিস্তিতে ছয়টি চেকের মাধ্যমে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় এফডিআর করেন। এরপর ওই টাকা কাজী সালিমুল হক কামাল ও অন্যদের মাধ্যমে সরিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়। মামলায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ‘নাম সর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অপরাধের সময়কাল বলা হয় ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর থেকে ২০০৭ সালের ২৮ মার্চের মধ্যে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের নামে পাওয়া টাকা দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে, কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে নিজের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে প্রধানমন্ত্রীর পরিচালিত তহবিলের টাকা ওই ট্রাস্টে দেন। পরে বিভিন্ন উপায়ে ওই টাকা আত্মসাত করা যায়, যার জন্য খালেদা জিয়াই দায়ী।
তারেক রহমান: প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহায়তায় তার ছেলে তারেক তাদের বাসস্থানের ঠিকনা ব্যবহার করে ‘অস্তিত্বহীন’ জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট সৃষ্টি করেন। ওই ট্রাস্টের নামে সোনালী ব্যাংকের গুলশান নর্থ সার্কেল শাখায় হিসাব খুলে সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা জমা করেন। পরে ট্রাস্ট ডিডের শর্ত ভেঙে ওই টাকা তিনি ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন সালিমুল হক কামালকে দেন। পরে সেখান থেকে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা বিভিন্ন  প্রক্রিয়ায় আত্মসাত করা হয়। তারেকের ফুপাতো ভাই মমিনুর রহমানও একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাতে সহযোগিতা করে অপরাধ করেছেন।
সাবেক সাংসদ সালিমুল হক কামালের সঙ্গে ওই ট্রাস্টের কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও তিনি তারেক রহমানের কাছ থেকে পাঁচটি চেক নিয়ে এফডিআর করেন এবং পরে তা ভাঙান। সে সময় প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শাখা ব্যবস্থাপকদের দিয়ে সৈয়দ আহমেদ ও গিয়াস উদ্দিন আহমেদ নামের দুই ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে এফডিআর ভাঙিয়ে সেই টাকা শরফুদ্দিন আহমেদের অ্যাকাউন্টে জমার ব্যবস্থা করেন। তখনকার মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল গঠন ও পরিচালনার জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অনুমোদন নিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে সেখানে এতিম তহবিলের টাকা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মূল নথি সংরক্ষণ না করে তা তিনি গায়েব করে দেন। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি ওই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন।
ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন এই আত্মসাতে সহযোগিতা করে ব্যংকে তার নিজের নামের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। মামলা হওয়ার পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ বাসুদেব রায় ছয় আসামির বিরুদ্ধে ফৌজদারি দ-বিধির ৪০৯ এবং দুদক আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন।
এর মধ্যে খালেদা জিয়া ও কামাল সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দুই ধারাতেই অভিযোগ আনা হয়েছে। আর বাকি চারজনের ক্ষেত্রে কেবল দ-বিধির ৪০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আদালতে বলেছেন, এই ঘটনায় খালেদা জিয়া জড়িত নন, এবং সেই টাকাও আত্মসাৎ করা হয়নি, কারণ এসব টাকা এখনো ব্যাংকের হিসাবেই জমা রয়েছে। আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে করা সবগুলো মামলাই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে করা, যার কোনোটির আইনি ভিত্তি নেই। এই মামলাটিও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনটিকে বানোয়াট বলেও তিনি বর্ণনা করেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আদালতে তারা অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছেন।


প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৯:০২:১৪ পুর্বাহ্ন



 
Advertise