আজ - বুধবার, ২২ আগস্ট, ২০১৮ ইং | ৭ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

এখনও বনমোরগ-মুরগির বিচরণ

মোঃ মামুন চৌধুরী,হবিগঞ্জ: জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অপেক্ষাকৃত দুর্গম পাহাড়ি স্থানে অবস্থিত রেমা-কালেঙ্গা। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ প্রাকৃতিক বনভূমি। এর আয়তন প্রায় ১৭৯৫.৫৪ হেক্টর। এজন্যই সমৃদ্ধ মিশ্র চিরহরিৎ বনটি এখনো টিকে আছে। অভয়ারণ্যটির আশেপাশে রয়েছে ৩টি চা-বাগান। এ বনে বিভিন্ন বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও পশুপাখির আবাসস্থল।
জরিপ মতে জানা গেছে, এখানে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। আদিবাসী সম্প্রদায় ত্রিপুরা, সাঁওতাল ও উড়ং এই বনভূমির আশেপাশে এবং অভ্যন্তরে বসবাস করছে। বিরল প্রজাতির বাঘের বিচরণও রয়েছে এ জঙ্গলে। আরো বিচরণ করছে বনমোরগ ও বনমুরগির। এ প্রাণিটি এ বনের ঐতিহ্য বহন করছে। পরিদর্শনে যে কেউ এসব অবলোকনে মুগ্ধ হবে।
এ ব্যাপারে বনগবেষক মোঃ আহমদ আলী বলেন, বনমোরগ ও বনমুরগি মানুষের পায়ের শব্দ পেলেই ত্বরিত বেগে পালিয়ে যায়। এরমধ্যেই কক্-কক্ ডাক শুনে আর একঝলকের দেখাতেই তৃপ্তি মেটাতে হয়। তার পরও এরা মানুষের কবল থেকে রক্ষা পাওয়াটা কঠিন।
বিশেষ করে স্থানীয় একশ্রেণির লোকেরা বনমোরগ-বনমুরগি শিকারে সুযোগে থাকেন। ঘরে পোষা মুরগি থাকা সত্ত্বেও বনের এই পাখির প্রতি এসব লোকদের লোভের সীমা নেই। সে কারণে কমে গেছে এদের সংখ্যা। পড়ে গেছে বিপন্ন পাখির তালিকায়।
তিনি বলেন, সিলেট বিভাগের চা-বাগানগুলো না থাকলে বনমোরগ প্রায় বিলুপ্তই হয়ে যেত। শিকারিরা চা-বাগানে ঢুকতে পারে না বলে ঘন চা-বাগানে এরা অনেকটা নিরাপদে থাকে। তবে প্রাকৃতিক বনে বাস করা বনমুরগি তো শিকারীরা শিকার করেই, উপরন্তু তাদের বাসা থেকে ডিমও সংগ্রহ করে। এ কারণে প্রাকৃতিক বনে এদের সংখ্যা কমছে। বনমুরগির ডিম গৃহপালিত মুরগির ডিমের সঙ্গে রেখে তা দিয়ে দেখা গেছে, কখনো কখনো ডিম ফুটলেও ছানা বাঁচেনি।
এরা খুবই সতর্ক পাখি। খুব সকালে ও সন্ধ্যার আগে বনের কাছাকাছি খোলা জায়গায় খাবার খেতে বের হয়। দ্রুত দৌড়াতে পারে এবং উড়তে পারে। বাংলাদেশে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের চিরসবুজ বন, চা-বাগান, শেরপুর ও মধুপুর শালবন ও সুন্দরবনে বনমোরগ বাস করে।
বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ায় বনমোরগ ও মুরগি দেখা যায়। পাহাড়ের পাদদেশে ঘন প্রাকৃতিক ঝোপের ভেতর মাটিতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসে এরা বাসা করে। ছয়-সাতটি ডিম দেয়। বনমুরগি শুধু ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালন-পালনে ব্যস্ত থাকে। ডিম থেকে ছানা ফুটতে ২০-২১ দিন সময় লাগে। ছানারা বাসা থেকে নেমেই খাবার খেতে পারে।
পাহাড়, টিলা, চা-বাগান ও প্রাকৃতিক ঘনবনের কাছাকছি নিরাপদ খোলামাঠে একাকি, জোড়ায় ও দলবদ্ধভাবে চরে বেড়ায়। প্রধানত, ফল, বীজ, শস্যকণা, কচিপাতা, কেঁচো ও কীটপতঙ্গ এদের খাদ্য। শীতের সময় কুয়াশা থাকা অবস্থায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। বনের কোনো গাছতলায় পাকা ফল ঝরে পড়া শুরু করলে বনমোরগ-বনমুরগি প্রতিদিন সকাল-বিকাল সেই গাছতলায় আসে। আবার বনের বড় গাছে উঠেও এদের ফল খেতে দেখা গেছে। দেখতে আমাদের গৃহপালিত মোরগ-মুরগির মতোই। তবে মোরগের লেজের দুটি পালক লম্বা থাকে।
ধারণা করা হয়, এরাই গৃহপালিত মোরগ ও মুরগির পূর্বপুরুষ। সুদূর অতীতে এশিয়া অঞ্চলে বনের এই পাখিকে পোষ মানানো হয়। তবে এক গবেষণায় জানা গেছে, এর সঙ্গে সংকরায়নের ফলে আজকের গৃহপালিত মোরগ ও মুরগির উদ্ভব হয়েছে।পরিশেষে তিনি বলেন, যাই হোক তারমধ্যেও কালেঙ্গা বনে বনমোরগ ও বনমুরগি ঠিকে আছে। এ খবরটি আমাদের কাছে সুসংবাদ।
এ ব্যাপারে কালেঙ্গা বনের কালিয়াবাড়ি আদিবাসী পুঞ্জির হেডম্যান বিনয় দেববর্মা বলেন, এ বনে প্রচুর বনমুরগি ও মোরগ রয়েছে। নানা সময়ে এদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। আমরা এগুলো রক্ষায় বনবিভাগকে সার্বিকভাবে সহায়তা করছি।  
তিনি বলেন এগুলো মাঝারি আকারের ভূচর পাখি। এদের মাথায় ঝুঁটি ও গলার দুই পাশে দুটি ঝুলন্ত লতিকা থাকে। ডানা গোলাকার; ডানার পঞ্চম প্রান্ত-পালকটি দীর্ঘতম। প্রথমটি দশমটির চেয়ে ছোট। লেজ দুপাশ থেকে চাপা’ লেজে মোট ১৪টি পালক থাকে। পুরুষটির মাঝের দুটি পালক লম্বা ও কাস্তের মত বাঁকানো। ঘাড় ও কোমর সরু এবং লম্বা কাঠির মত পালকে ঘেরা। পা শক্তিশালী ও লম্বা। নখরসহ মধ্যমার চেয়ে বড়। পরুষটির পায়ের পেছনে গজালের মত লম্বা নখর আছে। পুরুষ আর স্ত্রী নমুনার মধ্যে অত্যধিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রজাতিসমূহ লাল বনমোরগ, শ্রীলঙ্কার বনমোরগ, ধূসর বনমোরগ, সবুজ বনমোরগ।


প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৮:০২:৩৮ পুর্বাহ্ন



 
Advertise