আজ - বুধবার, ২২ আগস্ট, ২০১৮ ইং | ৭ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

শেষ ইচ্ছা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বীরঙ্গনা বলে চা শ্রমিক জানকী বাড়াইকের কুমারী জীবনধারণ

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এ হিসাবে দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৬ বছর হলো। দেশের স্বাধীনতা আদায়ে লাখো শহীদের রক্ত ও অসংখ্য মা বোনকে ইজ্জত দিতে হয়েছে।
স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে জেলার চুনারুঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী আমু চা বাগানের পুরান লেনের বাসিন্দা চা-শ্রমিক জানকী বাড়াইক পাক সেনাদের কাছে নির্মমভাবে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। পরে তিনি পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। এরপর থেকে বাগানেই বসবাস করে আসছিলেন। মৃত ঠাকুর দাস বাড়াইকের চার মেয়ের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়ে যায়। বীরাঙ্গনা হওয়ায় চা-শ্রমিক জানকী বাড়াইকের বিয়ে হয়নি। সেই থেকে এ পর্যন্ত কুমারী জীবনধারণ করতে হচ্ছে এ নারীকে। এমন সংবাদ জেনে এ প্রতিবেদক সরেজমিন আমু বাগানে যান।
এ সময় বীরাঙ্গনা কুমারী চা-শ্রমিক জানকী বাড়াইকের সাথে একান্ত আলাপ হলে তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে বলেন- মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তারা চার ভাই ও চার বোন আর মা বাবা মিলে বাড়ি ছেড়ে চিমটিবিল সীমান্তের কাংড়াবাড়ি এলাকায় গিয়ে বসবাস করছিলেন। আম- কাঁঠালের সময়ে একদিন তিনি ও তার বাবা ভাই মিলে বাড়িতে আসেন খাবার নেওয়ার জন্য। এ সময় প্রায় ১২ জন পাক সেনা তাদের পাকড়াও করে। পাক সেনারা তাদের চোখ বেঁধে ফেলে। এ সময় তার ভাই কৌশলে পালিয়ে গেলেও তারা পালাতে পারেননি। তাৎক্ষণিক পাক সেনারা তার ওপর পাশবিক নির্যাতন শুরু করে। পরে তাদেরকে চুনারুঘাট ক্যাম্পে নিয়ে আটকে রাখা হয়। সেখানেও পাক সেনারা তাকে পাশবিক নির্যাতন করেছে। আটক অবস্থায় প্রায় ২০ দিন অতিবাহিত হলে একদিন গুইবিল সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক সেনাদের তুমুল লড়াই শুরু হয়। এ সময় ক্যাম্প শূন্য থাকায় তিনি ও তার বাবা মিলে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। দেশ স্বাধীন হলো তারা বাড়ি ফিরে এলেন।
তিনি বলেন- লোকজন তাকে দেখে নানা রকমের অপমানজনক কথা বলে আসছিল। এ কারণে বিয়ে হয়নি। দেশ স্বাধীন হবার এপর্যন্ত কুমারী জীবন নিয়ে ৪৬ বছর হলো। এরমধ্যে পিতা-মাতাসহ  ৬ ভাই ও বোন মারা গেছেন। বেঁচে শুধু আছেন তিনি ও তার এক দিদি। শারীরিক অবস্থায় দুর্বল হওয়ায় চা-বাগানের কাজ ছেড়ে দেন। সেই থেকে স্বজনদের কাছে বসবাস করছেন। স্বজনরাই ভরন পোষণ করছেন।
কুমারী হওয়ায় বিধবা ভাতা পাচ্ছেন না। কিন্তু বয়স্ক ভাতার পাওয়ার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি এভাতা তার ভাগ্যে জুটেনি।
তিনি বলেন- লোকজনের কাছ থেকে শুনেছেন বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাচ্ছেন। আর এমপি কেয়া চৌধুরীর চেষ্টায়   হবিগঞ্জ জেলার চা বাগানসহ বিভিন্ন এলাকার এক পুঙ্গ ও ৫ বীরাঙ্গনা নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ কথা শুনার পর থেকে  তিনি চুনারুঘাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলে গিয়েছেন। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। তাই এবার এমপি কেয়া চৌধুরীর কাছে যেতে চান। তাঁর সহযোগীতায় তিনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে চান। এটাই চা-শ্রমিক জানকী বাড়াইকের শেষ ইচ্ছা।
পরিশেষে তিনি বলেন- বিয়ে হলো না। এ কারণে আমার কোন উত্তরাধীকার নেই। বাকী জীবনে আমার চলার পথে কি হবে? তাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে এগোচ্ছেন বলে তার মনে হচ্ছে।
এমপি কেয়া চৌধুরী বলেন, ২০০৬ সালে হবিগঞ্জ থেকে বীরাঙ্গনা রাজিয়া খাতুন, হিরামনি সাঁওতাল, সাবিত্রী নায়েক, মালতি রানী, পুস্প রানী, পুঙ্গ ফারিজা খাতুনসহ ৬ জন নারীকে খোঁজে বের করি। পরবর্তীতে তাদের গেজেটভুক্ত করার জন্য আবেদন করি। আমার আবেদনের প্রেক্ষিতে রাজিয়া খাতুনসহ ৬ নির্যাতিতা নারীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করেন। জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তাঁরা গেজেটভুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে হিরামনি সাঁওতাল মারা গেছেন। রাজিয়া খাতুনের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার তাকে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। এছাড়া অন্যান্য নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করছেন। তারপর আমার মনে হয়, তাদের আরো অনেক কিছু পাওয়ার রয়েছে। আমার কাছে মনে হয়, সামাজিকভাবে সে জায়গা থেকে সুস্পষ্ট ধারণা আসা উচিত। নারী মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য অবদান। যারা মাঠে ময়দানে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাদের চেয়ে কোন অংশে কম নন নারী মুক্তিযোদ্ধারা। সেদিক থেকে আমি বলবো রাজিয়া খাতুনসহ ৬ নারী মুক্তিযোদ্ধা প্রত্যেকে সকল সুযোগ সুবিধা পাবেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা মাথা উঁচু কারে দাঁড়াতে পারবেন।
সীমান্তবর্তী আমু চা বাগানের পুরান লেনের বাসিন্দা চা-শ্রমিক জানকী বাড়াইক পাক সেনাদের কাছে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ায় নাকি তার বিয়ে হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক। আমি তার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোরালো আবেদন করব।


প্রকাশ: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১০:০২:৪১ পুর্বাহ্ন



 
Advertise