আজ - রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ২ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

গারোকন্যা চর্যার আখ্যান

মাসুম রেজা
‘কালি ও কলম’ একটি পত্রিকা। এই পত্রিকা প্রতিবছর বছরের সেরা বই নির্ধারণ করে এবং পুরস্কৃত করে। ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’ নামে প্রবর্তিত এই পুরস্কারপ্রাপ্তির আশা প্রায় সকল লেখকই করেন। আরাধ্যও বটে। এই পুরস্কার কখনো কোনো নাট্যসাহিত্যের কপালে জোটেনি। তবে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে এবারের আসরে।
আলতাফ শাহনেওয়াজ বিরচিত ‘নৃত্যকী’ নামক পা-ুলিপি নাটকের বন্ধ্যাত্ব ঘুঁচিয়েছে এবার; পেয়েছে কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার। সংবাদটা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। যার প্রধান কারণ হলো, এই পা-ুলিপি আমি পূর্বেই পাঠ করেছিলাম এবং বিমোহিত হয়েছিলাম। ফলে পুরস্কারপ্রাপ্তির যথার্থতা নিয়ে আমার ভেতরে বিন্দুমাত্র প্রশ্ন জাগেনি। আলতাফ শাহনেওয়াজের ভাষ্যেই জানা যাবে নাটকের বৃত্তান্ত। তিনি বলছেন, ‘এই নাট্যবৃত্তে ফুটে আছে যে কাহিনীর ফুল, ছড়িয়ে রয়েছে সেথায় গারো সম্প্রদায়ের অজস্র নম্র নিশ্বাস। নেত্রকোনার বিরিশিরিতে বসবাসরত এই সরলমতি মানুষদের দিনরাত্রিগুলি আপাপবিদ্ধ, সর্বপ্রাণবাদী। নগরজীবনের ব্যস্ত তরঙ্গ ছোঁয় না তাঁদের, ওঁদের আকাশে নাই স্বার্থের গুপ্ত কালিমা। মিথ-গাথা-গল্প আর জীবনবাস্তবতা- সব মিলেমিশে সেখানে এক শুভময় বিশ্বাস ছায়া ফেলে অনুক্ষণ।’
এই প্রারম্ভিক গীতল গদ্য থেকে অনুমান করে নেওয়া যায় নাট্য গল্প সংগঠনের স্থান ও পাত্র সম্পর্কে। অতঃপর শুরু হয় মূল আখ্যানের এক নৈসর্গিক বিস্তার। যাঁরা কেবল দু’এক পাতা পড়বার উদ্দেশ্যে দু’একটা পাতা ওল্টান তারাও মুহূর্তে আটকে যান ‘নৃত্যকী’র দারুণ আলিঙ্গণে। সংলাপবৎ গীতল বাক্যগুলো ‘নৃত্যকী’কে করে তোলে এক অনুপম উপন্যাস বা কবিতা। ‘নৃত্যকী’ পাঠে সহজেই অনুমান করা যায় যে আলতাফ শাহনেওয়াজ কোন গুরুর ভজন সাধনে মগ্ন। তিনি আর কেউ নন আমারও গুরু তিনি সেলিম আল দীন। যিনি নাটককে কেবল নাটক বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন অনেক আগেই। তিনি শিখিয়ে গেছেন আখ্যান রচনা উপাখ্যান রচনা তারপর আরো পরিপূর্ণরূপে পাঁচালি রচনা যা মধ্যযুগের বাংলানাট্যের ভা-ার থেকে আহরিত। পাঁচালির স্বাভাবিক অর্থে আমরা ধরে নিই এর মধ্যে পাঁচটি উপাদান আছে; পদ, বোলাম, কথা, নাচাড়ি ও দিশা। এই পাঁচের মিলনে এক অদ্বৈতরূপ পরিগ্রহ করে নাটক যা আর তখন কেবল মঞ্চে প্রয়োগের অপেক্ষায় থাকে না নিজেই পাঠকের পাঠের মজা দিতে সক্ষম এক শিল্প হয়ে যায়। আলতাফ শাহনেওয়াজ তার ‘নৃত্যকী’কেও দিয়েছেন এই একই আভরণ। যার ভাঁজ খুলে খুলে পাঠক আস্বাদন করবেন গল্পের রস। তাকে মঞ্চে দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে না। পাঠ করেই তিনি জেনে যাবেন সোমেশ্বরী নদী তীরের গারোকন্যা কৃষ্টি চর্যার শিল্প সাধনার গল্প। সত্য সাধনার গল্প। শুনতে পাবেন কৃষ্টির কণ্ঠে যিশুর প্রার্থনাসংগীত।
কৃষ্টি চর্যা গান করে, নাচ করে তাইতো সে ক্রমে হয়ে ওঠে ‘নৃত্যকী’। তার বুকের মধ্যে হঠাৎই আকাশ ভর করে। দেখা দেয় কতশত প্রশ্ন। সে পড়ালেখার চেয়ে পাখিদের গান শোনানোকে মহৎ কাজ বলে ভাবতে থাকে। গারোদের গল্পগাথার নায়িকা সেরানজিং খলসে মাছের মত খলবল করে কৃষ্টি চর্যার শারীরিক কাঠামোতে। সেরানজিং-এর প্রেম, বেদনা ও সংগ্রাম আচ্ছন্ন করে চর্যাকে। সে নিজেই কী তবে সেরানজিং? প্রশ্ন জাগে তার ভেতর। অতঃপর চর্যার মস্তিষ্কের নালী বেয়ে শুরু হয় এক কল্পনার যাত্রা। এক গারো বালিকার গল্প বলতে গিয়ে আলতাফ শাহনেওয়া গল্পের ছলে বলে ফেলেন গারোদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। এবং ততক্ষণে পাঠক ভুলে যাবেন যে তিনি একটি নাটকের পা-ুলিপির দুটো পাতা উল্টেপাল্টে দেখতে চেয়েছিলেন। ‘এরপর কী ঘটে’ এই অদম্য আগ্রহ নিয়ে তিনি পাঠ শেষে উপন্যাসে অবগাহনের স্বাদ পেয়ে যাবেন। আমি যেমনটা পেয়েছিলাম। আলতাফ শাহনেওয়াজ যিনি ‘নির্লিপ্ত নয়ন’ নামে লিখতেন তার ‘নৃত্যকী’ আপনাকে পাঠের প্রকৃত আনন্দ দেবে আমি নিশ্চিত।
প্রকাশক : চৈতন্য।
প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান।
মূল্য : ১৩০ টাকা।


প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১০:০২:৫৮ অপরাহ্ন



 
Advertise