আজ - শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

ঐতিহ্যের প্রতি এই অবজ্ঞা কেন?

কীট-পতঙ্গ ও পোকামাকড় থেকে শুরু করে জীব অণুজীব প্রত্যেকে কাজ করে। এবং এই কাজ যে প্রত্যেকে আনন্দের সঙ্গে করে তা লেখা আছে নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের ‘কাজের আনন্দ’ কবিতাটিতে। অতি ক্ষুদ্র যে পিপীলিকা সে তার ক্ষুদ্রতম শক্তি দিয়ে খাবার সংগ্রহ করে। ছোট্ট যে পাখি সেও কত পরিশ্রমে সামান্য তৃণলতা যোগাড় করে বাসা বানায়। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। কাজের আনন্দ নিয়ে কাজ করা প্রকৃতির যে কোনো প্রাণীর স্বাভাবিক প্রবণতার মধ্যে পড়ে। একটি ছোট্ট প্রাণীর মনেও যদি আনন্দের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা থাকে তাহলে মানুষের কেন থাকবে না?
প্রকৃতিতে মানুষকেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা করে সারাদিন ব্যাংকে বসে টাকার হিসেব করছেন অথবা পদার্থ বিজ্ঞানে ফেলোশিপ করে মধ্যপ্রাচ্যে লিমুজিন চালাচ্ছেন এমন অসঙ্গতি বিরল নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে তাতে অসুবিধা কোথায়। কেজো মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই না দেশে প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। অলস অন্যমনস্ক অকাজের ভাবুকের সংখ্যা কমলেই কি ভালো নয়? অ-গৃহী উদাসীন বাউল জাতীয়দের সংখ্যা বাড়লে কী এমন লাভ দেশের? দু’টো গান বা দু’টো হাসির গল্প, দু’ একটি আষাঢ়ে গল্প কয়েকটি কবিতার জন্ম দেওয়া ছাড়া এসব মানুষের আর কাজ কী? তা এক অর্থে কথা মিথ্যে নয়। এসব মানুষের চরিত্র যে ব্যাকরণ দিয়ে তৈরি তার ভাষা বোঝার মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমছে। হয়ত তাই সজলং সুফলং মলয়ং প্রকৃতির বদলে পাচ্ছি আকাশ সমান স্কাইস্ক্র্যাপার, নিউরো প্রযুক্তির ব্রেইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট, সুপার কম্পিউটিং মোবাইল, চালকবিহীন গাড়ি, জেনেটিং এডিটিং। পেয়েছি তো অনেক। কিন্তু কিছুই কি হারাইনি?
প্রতিদিন আমাদের জীবন থেকে কিছু না কিছু হারায়। দিন শেষে হিসেব মেলাতে গেলে দেখা যাবে হারানো জিনিসের ভিড় দিন দিন বাড়ছে। হারানো জিনিস হারিয়েই যায়-প্রতীক্ষা করলে হারানো জিনিস ফেরত আসে এই ভুল আগেই ভেঙেছে। পথ চেয়ে এবং কাল গুনে কাঙ্ক্ষিতের দেখা মেলে-সেই ভুল ভেঙেছে আরো আগে। যতœ ও চর্চার অভাবে জীবন থেকে যেমন প্রতিদিনই কিছু না কিছু হারাচ্ছি তেমনি অযতœ অবহেলায় প্রকৃতিকেও করেছি নিঃস্ব। বাংলাদেশের চেহারা চেনাতে একসময় কবিরা লিখতেন, এই সেই দেশ যেখানে বয়ে চলে ধলেশ্বরী। যার তীরে তমালের ঘনছায়া। বাংলাদেশের কোনো নদীর তীর এখন তমালের ছায়াঘেরা নয়। তমাল গাছই আর অবশিষ্ট নেই। সাহিত্যে ঢেঁকিশাল একটি পরিচিত শব্দ ছিল। বাংলা ভাষার একেবারে আদি নিজস্ব শব্দ ঢেঁকি। ঢেঁকিশাল শব্দ বন্ধটির মাধ্যমে গ্রাম বাংলার ঋদ্ধ একটি আয়োজনের ছবি আমাদের সামনে হাজির হয়। কিন্তু তা ওই ছবিতেই। গ্রাম বাংলাতেও কি সচরাচর ঢেঁকির দেখা মেলে আজকাল? ঢেঁকিশালের জায়গা দখল নিয়েছে চালের মিল কল। ঢেঁকি নিয়ে রচিত গান গল্প ছড়া শ্লোকগুলি ময়মনসিংহ গীতিকার মতই সংগ্রহে রাখার লোক সাহিত্যে পরিণত হচ্ছে। এক ‘ধান ভানতে শীবের গীত গাওয়া’ প্রবাদটির মধ্যেই তো নৃতাত্ত্বিক এবং গবেষকদের জন্য রয়েছে গ্রাম বাংলার কত সামাজিক অনুষঙ্গ।
ঢেঁকিশাল এবং তমাল গাছের মতো আরো কত কীই না হারিয়েছি। ঘন বাঁশ আর বেতের ঝোঁপগুলো নেই। বিলুপ্ত হয়ে গেছে আজ শ্যাওড়ার বন। জলাধার থেকে হারিয়ে গেছে শোলা আর হোগলা গাছ। লোহার গরাদ দেওয়া একতলা দোতলা বাড়ি খুব সহসা আর চোখে পড়ে না। নেই বায়োস্কোপওয়ালা, কুলফিওয়ালা। কাঠ কয়লার হাপড়ে গনগনে আগুনে কাঁসা পেতলের পুরোনো ঘটিবাটি মেরামতওয়ালারাও কি আছে কোথাও? হারিয়ে গেছে মনসার ভাসান। হারিয়ে যাচ্ছে যাত্রাপালা। যাত্রার নামে যা আছে তার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী যাত্রার কোনো মিল নেই। কড়ির আলনা, বেতের প্যাটরা, কাঁঠাল কাঠের জলচৌকি, কাঁসা পেতলের হাড়ি কলস, কোথাও দেখেন আর? মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহজ সংযোগ হারিয়েছে। এখন কেজো মানুষের নিজের সন্তানেরও মনের খবর রাখার সময় নেই। নদীর তীর, গাছের ছায়া, খোলা মাঠের দখিন হাওয়া, আমের মঞ্জুরি, কাঁঠালের মুচি, কোকিলের ডাক, শান্ত সকাল অকেজো মানুষের সুখের অনুষঙ্গ ছিল। কোন ঝোঁপে বৈচি পাকলো, কোন প্রতিবেশীর কোন বাগানের, কোন গাছে আমের গুটি বেঁধেছে, কোন বাঁশতলায় শেয়া কুলগুলো খেতে মিষ্টি, বনঝোঁপের নীচে কচু ওল ও বনকলমি খাওয়ার উপযুক্ত হলো কিনা, অকেজো মানুষরা আনন্দের সঙ্গেই এ খবর রাখতো। উড়ি ধানের ক্ষেতে ঝাঁকে ঝাঁকে বক বসে থাকার দৃশ্য হয়ত কোনো মিউজিয়ামে থাকলে থাকতে পারে বাস্তবে নেই। একেকজন কেজো মানুষের পরিপাটি মুখশ্রীর আড়ালে বাংলার আদি-অকৃত্রিম জিনিসের প্রতি অবজ্ঞার যে আভাস পাই তাতে মনে হয় যা হারিয়েছি তা হারানোর বোধটাই না একসময় হারিয়ে যায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক


প্রকাশ: ২ মার্চ ২০১৮, ৮:০৩:৪৬ পুর্বাহ্ন



 
Advertise