আজ - শনিবার, ২৩ জুন, ২০১৮ ইং | ৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

কোটা সংস্কার এখন সময়ের দাবি

বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ। দেশের সর্বস্তরের মানুষ তাদের সন্তানদের সুশিক্ষিত করার চেষ্টা করছে। মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের চাহিদা হলো সন্তান পড়ালেখা করে একটা সময় সরকারি চাকরি করবে। আর বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে সরকারি চাকরির অর্ধেকের বেশি রয়েছে কোটাধারীদের দখলে। যেকোনো কোটারই একটি নির্দিষ্ট সময়, এরপর তা বিলুপ্ত করা হয়। ব্রিটিশদের সময় থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯১৮ সালে প্রথম কোটার প্রচলন শুরু হয়। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে ব্রিটিশদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় ভারতীয়দের জন্য আলাদা কোটার ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তী সময় শিক্ষায় অনগ্রসর মুসলমানদের জন্যও আলাদা কোটা সংরক্ষণ করা হয়। পাকিস্তান আমলে পিছিয়ে পড়া পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) মানুষের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রদেশভিত্তিক কোটা চালু করা হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৫ ডিসেম্বর তৎকালীন সংস্থাপন সচিবের এক নির্বাহী আদেশে কোটা পদ্ধতি বাংলাদেশে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
বর্তমানে দেশে মুক্তিযোদ্ধার ছেলে ও মেয়ে, নাতি-নাতনি কোটা, জেলা কোটা, উপজাতি কোটা, পোষ্য কোটা, নারী কোটাসহ ২৫৭ ধরনের কোটা বিদ্যমান। বাংলাদেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোটা ৫৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে ৭০ শতাংশ কোটার দখলে। বর্তমানে সরকারি চাকরির মধ্যে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)-এ চাকরি তরুণদের প্রথম পছন্দ। এই চাকরির কোটার বিন্যাস হলো মুক্তিযোদ্ধা ৩০ শতাংশ (ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি), নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ৫ শতাংশ উপজাতি। মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দেশে এখনো বিতর্ক রয়েছে। প্রতিবছর এই তালিকা বেড়েই চলছে। পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী দেখা যায়, প্রায় ১৫ কোটি মানুষের দেশে মাত্র দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। অথচ বিসিএস-এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এই কোটাধারীরা চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ সুবিধা গ্রহণ করে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১.১০ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য একই চাকরিতে বরাদ্দ ৫ ভাগ কোটা । অর্থাত্ মেধা কোটায় নেওয়া হবে মাত্র ৪৫ শতাংশ।
সংবিধানের ২৮নং অনুচ্ছেদে আছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।
সংবিধানের ২৯নং অনুচ্ছেদে আছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।
১। কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।
যদিও এই অনুচ্ছেদেই ৩টি বিশেষ ক্ষেত্র বলা হয়েছে, নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইবে।
কোটা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। সংবিধান অনুযায়ী নারী কোটা, জেলা কোটা ও প্রতিবন্ধী কোটার গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা অনুযায়ী ৫ শতাংশ উপজাতি কোটা ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা কোনোভাবেই সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়া সম্ভব না। অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাধারী, চাকরি পাচ্ছেন শুধুমাত্র বাবা ও দাদুর কর্মের কারণে। ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া মুক্তিযোদ্ধার এই তালিকায় এখন অংশীদার করা হয়েছে নাতি-নাতনীদের। যা একটি দেশকে পিছিয়ে নেওয়ার জন্যই যথেষ্ট। যা কোটাধারী ও একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি বড় ধরনের বৈষম্য বটে।
বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের ও ২০৫০ সালের মধ্যে দেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার পরিকল্পনা করেছেন। তাই দেশের উন্নয়নে প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, চিকিত্সক, দক্ষ প্রশাসক। ৫৬ শতাংশ বা এর উপরে কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত কম মেধাবী সম্পন্নরা দেশের দক্ষ জনবলের স্থান কতটা পূরণে সক্ষম, তা কি আরো একবার ভেবে দেখা উচিত নয়?

লেখক :শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
 


প্রকাশ: ২ মার্চ ২০১৮, ৮:০৩:১৯ পুর্বাহ্ন



 
Advertise