আজ - শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের স্বীকৃতি আর একটি যুগান্তকারী ইতিহাস

অস্তিত্ব নিয়ে যতবার প্রশ্ন উঠেছে, বাঙালি জাতি পিছপা হয়নি একবারও। ১৭৫৭ সালের পর থেকেই তার হারানো স্বাধীনতাকে ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য সন্তর্পণে যুদ্ধ করছে, কখনও প্রত্যক্ষ এবং কখনও পরোক্ষভাবে। অবশেষে সফল হয়েছে ১৯৪৭ সালে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মের মাধ্যমে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর নতুন করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নানা দুর্নীতি, শাসন-শোষণ এবং নির্যাতনের কবলে পড়ে বাঙালিরা। ফলে শুরু হয় প্রতিবাদ-সংগ্রাম। অবশেষে চূড়ান্তভাবে আমরা জয়ী হয়েছি ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। এই মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অবদান রেখেছেন। কখনও তারা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন, আবার কখনওবা যুদ্ধ করেছেন অস্ত্র হাতে তুলে। নিয়েছেন পুরুষের পাশাপাশি সশস্ত্র প্রশিক্ষণ।
১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, সেই সময়ে যেখানে নারীদের স্বাভাবিক চলাফেরাতেই নানা নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল সেখানে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করাটা ছিল  খুবই কঠিন। তবুও নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যে সকল নারী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গোবরা ও লেম্বুছড়া ক্যাম্প। তাছাড়া উইমেন্স কো-অর্ডিনেটিং কাউন্সিলের প্রশিক্ষণ, মেজর জিয়াউদ্দীন বাহিনীর প্রশিক্ষণ, মেজর জলিলের নারী বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও সিরাজ সিকদার বাহিনীর ক্যাম্প প্রশিক্ষণও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের যে সকল নারী সাহসিকতা নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে এগিয়ে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে ডা. সেতারা বেগম ও তারা ভানু বিবিকে (তারামন বিবি) বাংলাদেশ সরকার বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করে। বীর প্রতীক তারামন বিবি পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কুড়িগ্রামের শঙ্কর মাধবপুর গ্রাম থেকে। তিনি ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরে। যুদ্ধ করেছেন, সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের বীর উত্তমের নেতৃত্বে। ক্যাম্পে যখন যোগ দেন তারামন তখন তার বয়স ছিল ১৩/১৪ বছর।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এই রকম আরেকজনের নাম শিরীন বানু মিতিল। তিনি যখন হাতে অস্ত্র তুলে নেন, তখন তার বয়স ২১। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে শিরীন বলেছিলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধে জড়িত ছিলাম শুরু থেকেই। ২৫ মার্চ আমি তখন পাবনায় ছিলাম। টেলিফোন ভবনে যে যুদ্ধটা হয় আমি সেখানে যুদ্ধে যোগ দেই। আমার সঙ্গে আমার দুই কাজিনও ছিল এবং আমি ছেলেদের মতো পোশাক পরেই ওখানে চলে গিয়েছিলাম, কারণ বাংলাদেশে মেয়েদের জন্যে সবসময় দৌড়াদৌড়ির জায়গায় যাওয়াটা ঐ সময়ে একটু সমস্যা ছিল।
নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের নারীর অবদান রয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যারা হাতে অস্ত্র তুলে নেননি, তারা করেছেন সেবা। ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে মানুষের সেবা করেছেন। সেবা করেছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কথা তো সবার জানা। তৎকালীন শিল্পীরা ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন।
ইতিহাসে আমরা এমনও জেনেছি মা নিজের সন্তানকে বলেছিলেন, আমি কী তোমাদেরকে পেটে ধরেছি ঘরে বসে থাকার জন্যে? তোমরা যুদ্ধে যাও। এবং মনে রেখ তোমাদের পিঠে যেন গুলি না লাগে। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। ঠিক তেমনি বাংলার ঘরে ঘরে মায়েরা ছেলে সন্তানদেরকে যেমন সাহস জুগিয়েছেন, তেমনি নিজেরাও কিন্তু প্রতিরোধে অংশ নিয়েছেন এবং যুদ্ধের সময়ে গেরিলাদের আশ্রয় দেওয়া, খাবার তৈরি করে দেওয়ার কাজ করেছেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে খাবার মাথায় করে নিয়ে, ছদ্মবেশে তাদের কাছে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। বর্ডার এলাকায় অনেক মেয়ে, কিশোর-কিশোরী, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্যে ক্যাম্পে সারিবদ্ধভাবে নাম লিখিয়েছে এবং আগরতলার বিশ্রামনগর হাসপাতালে সেখানে এক বিশাল গ্রুপে মেয়েরা অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে এবং নার্সিং ট্রেনিং নিয়েছে। সেবামূলক কর্মকা-সহ সব জায়গায় সর্বক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক।
বলতে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার আরেক নাম ছিল নারীদের সাহসিকতা। তত্কালীন নারীরা তাদের জীবনসঙ্গি থেকে শুরু করে নিজ সন্তানদের পর্যন্ত উৎসর্গ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি স্বাধীনতার জন্য। যার একটি বাস্তবচিত্র পাওয়া যায় সেলিনা হোসেনের ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে ত্রিশ লাখ মা-বোন হারিয়েছেন তাদের সম্ভ্রম, অনেকেই হয়েছেন শহীদ। তবুও পিছু হটেননি মুক্তিপাগল এই নারী বীরেরা। একাত্তরের ডিসেম্বরে মাদার তেরেসা খুলনা ও ঢাকার কয়েকটি ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। ওখানে তিনি দেখেন, পাকসেনারা কী পাশবিক তা-ব চালিয়েছে। এসব ক্যাম্পে পাকসেনারা বাংলাদেশের নারীদের উপর দিনের পর দিন অত্যাচার চালিয়ে আসছিল। কেবল তাদের নগ্ন করেই রাখত না, অভাগীরা যাতে লম্বা চুল পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করতে না পারে এই ভাবনায় তাদের চুল কেটে দিত। এসব ক্যাম্পে তিনি কাউকে পাননি কিন্তু দেখেছেন তাদের ছেঁড়া চুল, ব্যবহূত পোশাক। যুদ্ধের সময় নানাভাবে নির্যাতনের শিকার এসব নারী যোদ্ধারা স্বাধীন দেশেও হয়েছেন নিগৃহীত। সমাজ আজও তাদেরকে একঘরে করে রেখেছে। অথচ বিবেক তাদের একবারও ডেকে বলে না কাদের আত্মত্যাগের রক্তে রাঙানো বাংলাদেশ।
নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ স্বাধীন হয়। দেশমাতার সেরা সন্তানদের দেওয়া হয় সর্বোচ্চ সম্মানসূচক উপাধি। এখানেও নারী মুক্তিযোদ্ধারা হন বঞ্চিত। ৭ বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ বীরউত্তম, ১৭৫ বীরবিক্রম ও ৪২৬ বীর প্রতীকের মধ্যে মাত্র দুইজন নারী পান বীর প্রতীক উপাধি। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, সহায়তাকারী এমনকি তথ্যদাতারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেও নারী মুক্তিযোদ্ধারা থাকেন বঞ্চিত। ন্যূনতম মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পর্যন্ত তারা পাননি।
যদিও ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সম্মান জানান। তার নির্দেশনায় বীরাঙ্গনাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কাজও শুরু হয়, যা ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের আগ পর্যন্ত চলেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এ প্রক্রিয়াটিও বন্ধ হয়ে যায়।
অবশেষে বিভিন্ন সংগঠনের দাবির মুখে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত ইচ্ছায় তার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ‘বীরাঙ্গনা’দের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই মধ্যে এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনাও আসে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর ২০১৪ সালের ১০ অক্টোবর ‘বীরাঙ্গনা’দের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল। পরে ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে এই প্রস্তাব পাস হয়।
অবশেষে সরকার একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী এবং রাজাকারদের হাতে নির্যাতিত ৪১ বীরাঙ্গনার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করে। ২০১৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ গেজেট প্রকাশ করে। এই ৪১ ‘বীরাঙ্গনা’কে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। তাদের স্বীকৃতি দেওয়ায় জাতির অন্যতম একটি প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। এখনও অনেক নারী মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন যারা ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতিটুকুও পাননি। অনেকে রয়েছেন যারা যুদ্ধের সময়ের নানা নিপীড়নের স্বীকার হয়ে আজও কষ্টে-দুঃখে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। সরকারকে এ ব্যাপারে আরো আন্তরিক হয়ে সকল নারী মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজে বের করে তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে এবং সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়


প্রকাশ: ২ মার্চ ২০১৮, ৮:০৩:৫০ পুর্বাহ্ন



 
Advertise