আজ - শনিবার, ২৩ জুন, ২০১৮ ইং | ৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

দারিদ্র্য বিমোচনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি : নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য ইতোমধ্যে প্রমাণিত। অতি সম্প্রতি এ বিষয়ে চীন ও বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতি বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অর্জনকে বিস্ময়কর ও চমৎকার বলে অভিহিত করেছেন বিশ্বব্যাংকের সফরকারী প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। তার মতে, এ দেশের অর্জিত অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্য দেশের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার এই মূল্যায়নে আবারো বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলো। একই সঙ্গে দেশের

গন্ডি ছাড়িয়ে সুদূর বিশ্ব পরিমন্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা এবং ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেলো।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ঢাকা সফরে আসেন দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের উন্নতির বিষয়ে অবহিত হতে। এ নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি গণবক্তব্যেও অংশ নেন। সেখানে তিনি পুরো সময় ধরেই বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষের জীবন গাঁথা, দারিদ্র্য জয়ের কাহিনী, যা বাস্তবে পরিণত হয়েছে, তা তুলে ধরেন। আমাদের দারিদ্র্য জয়ের নেতৃত্বে আছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই এই অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছেÑ এ কথাও অকপটে স্বীকার করেন বিশ্বব্যাংক প্রধান। তিনি বাংলাদেশে আসার কিছুদিন আগে চীনা প্রেসিডেন্টও বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশের উন্নয়ন পথযাত্রায় তাঁর দেশের নিত্যসঙ্গী হিসেবে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে বিষয়টি আমাদের আশা জাগিয়েছে ভবিষ্যৎ পথ চলতে। সম্প্রতি দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক গণবক্তৃতা অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে প্রসঙ্গক্রমে চীন ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের প্রশংসাসূচক বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিজেদের প্রশংসা শুনতে ভালো লাগে এবং দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা পাই। দারিদ্র্য বিমোচনে যে অর্জন তা দেশের আপামর জনগণের সমর্থন-সহযোগিতার জন্যই সম্ভব হয়েছে।’ দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট ‘এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্য দেশও সুফল পাবে’ বলে অভিমত প্রকাশ করেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে পৃথিবীতে ১০ কোটি মানুষকে অতিদারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশে অতিদারিদ্র্যের হার যেখানে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় তা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের দল গড়ে তুলে বাংলাদেশে ডায়রিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার কথা স্মরণ করেন বিশ্বব্যাংক প্রধান। জনগণের পেছনে বিনিয়োগ করা ঠিক ততটাই জরুরি, যতটা জরুরি অবকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ। অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সেই বিনিয়োগ বাংলাদেশে সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রতিশ্রুতি দেশ ও জনগণের প্রতি বিশ্বব্যাংকের কমিটমেন্টও বটে। এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের উন্নয়নে যুক্ত অপরাপর দাতা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাকে এখানে কাজ, বিনিয়োগ ও ঋণ সহায়তা দিতে উৎসাহিত করবে। দেশে বিদ্যমান অপুষ্টি দূর করতে বাড়তি ১ বিলিয়ন ডলার দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক প্রধান। বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন দেশে ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তাও ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে। শিশুর অপুষ্টি দূর করতে বাংলাদেশকে আগামী দুই বছরে বাড়তি ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয় বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক তিন বছরের প্যাকেজে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এসিসটেন্স হিসেবে বাংলাদেশকে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। এর আওতায় এ পর্যন্ত আমরা ২৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছি বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এসিসটেন্সের আওতায় চার বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয় বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৯৪৪ মিলিয়ন এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হয়। পুরো প্যাকেজের প্রতিশ্রুতির মধ্যে মোট কী পরিমাণ পাওয়া গেল, তার হিসাব পাওয়া যাবে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্যে বিশ্বব্যাংকের ভাবনাকে ‘স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উন্নয়নে এক সাথে কাজ করবে এই সংস্থা, এটি আশার বিষয়। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের যোগাযোগসহ সব খাতেই বিশ্বব্যাংক সহায়তা দিয়ে থাকে।  বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গেই আছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এ সাফল্য উদ্যাপন করতেই বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আসেন। দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্যের জন্যই এবার ‘বিশ্ব দারিদ্র্যমুক্ত দিবস’ বাংলাদেশে পালন করা হয়েছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশ বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, এখন তা ৭ দশমিক ১১ শতাংশে পৌঁছেছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা হবে বিশ্বব্যাংকের সহায়তার অন্যতম ‘ফোকাস’। সরকারের সাম্প্রতিক মহৎ ও যুগান্তকারী উদ্যোগ- খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি দরে প্রতিজনকে মাসে ৩০ কেজি হারে ৫০ লাখ হতদরিদ্রের মাঝে চাল বিতরণ করা হবে। এ কর্মসূচির সাফল্যে দারিদ্র্য বিমোচন গতি পাবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে দারিদ্র্য্র বিমোচন, শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অন্যান্য সামাজিক খাতে বিশাল যে কর্মযজ্ঞ চলছে তার সুফল যাতে দেশবাসী নিবিড়ভাবে পায় তা নিশ্চিত করতে হবে এবং সর্বক্ষেত্রে মনিটরিং বাড়াতে হবে। একই সাথে বিশ্বের উদীয়মান, উন্নত ও উন্নয়নশীল সকল দেশ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসমূহের সঙ্গে সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখা জরুরি। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে মধ্যম আয়ের দিকে। সবকিছু ঠিক থাকলে মার্চের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ঘোষণা আসবে জাতিসংঘ থেকে।
 


প্রকাশ: ৪ মার্চ ২০১৮, ৭:০৩:৪১ পুর্বাহ্ন



 
Advertise