আজ - বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ইং | ৩ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ: 

কৃষকের চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক

বাংলার সবুজ মাঠ এখন পাকা ধানে ভরা। বোরো-আমন পাকা ধানের গন্ধে মাতোয়ারা কৃষক। সারাদেশে চলছে বোরো-আমন কাটার ভরা মৌসুম। কৃষকের ঘরে ঘরে চলছে  আনন্দের বন্যা। তাদের আঙিনায় এখন সোনারঙা ধানের ছড়াছড়ি। আশানুরূপ ফলনে কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি। হাটে ধানের দামও মিলছে ভালো। তাই উৎসাহ আর উদ্দীপনায় চলছে কৃষকের কাস্তে। টানা পাঁচ বছর লোকসান গোনার পর হিসাব কষে এবার লাভের কথাই বলছে কৃষক। ধান কাটা, মাড়াই, বাছাই আর বিক্রি নিয়ে দারুণ ব্যস্ত কৃষক।  একদিকে ধান কাটা হচ্ছে, অপরদিকে সেই ধান মাড়াই করা হচ্ছে। রাস্তায় ধান মাড়াই ও শুকানো হচ্ছে। বাজারে নতুন ধান উঠতে শুরু করায় চালের বাজারও স্থিতিশীল রয়েছে। ভেজা ধান ৮০০ থেকে ৯২০ টাকা মণে বিক্রি হচ্ছে। গ্র্রামে গ্রামে নবান্নের আনন্দ বইছে। কৃষিভিত্তিক শ্রমের বাজারেও চাঙ্গাভাব। আমন ধানকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব সৃষ্টি হয়েছে। দেশে উৎপাদিত ধানের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে আমন থেকে। বোরো থেকে আসে প্রায় ৬০ শতাংশ। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, বগুড়া, রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে গুটি স্বর্ণা ধান বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৭৬০ টাকায়। গ্রত মৌসুমে প্রতি মণ গুটি স্বর্ণা বিক্রি হয় ৪৮০ থেকে ৬৫০ টাকায়। চিকন চালের ধান বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে ৯২০ টাকায়। কয়েক বছর ধানের দাম নিয়ে তিনি হতাশ হলেও এবার দারুণ খুশি কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিইএ) সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ৫৬ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫৫ হাজার টন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত অর্থবছরে ৫৫ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার টন আমন ধান উৎপাদন হয়। মাঠে পুরোদমে আমন ধান কাটা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আবাদের অর্ধেক এলাকার ধান কাটা শেষ হয়েছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় এবার কৃষকরা দারুণ খুশি। উত্তরের চার জেলা বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা ও সিরাজগঞ্জেও ভালো দাম পাওয়ায় খুশি কৃষক। গত বছরের তুলনায় এবার মৌসুমের শুরুতেই ধান মণপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি দরে কেনা-বেচা হচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, এবার চালের বাজার চড়া থাকায় ধানের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ফলনও ভালো হওয়ায় গত বছরের মতো এবার লোকসানের আশঙ্কা নেই। যে কারণে মৌসুমের শুরুইে খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়েছে কৃষক-কৃষাণীর চোখে-মুখে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত ওই চার জেলায় মোট আবাদ করা আমনের অন্তত ৬৫ শতাংশ কাটা হয়ে গেছে। চিকন জাতের ধান যেমন- বিনা-৭, বি আর-৪৯, রণজিত, স্বর্ণা, পাইজাম ও কাটারিভোগ ধানই আগে পেকেছে। আর ব্রি-৩৩, ব্রি-৩৯, ব্রি-৫৬সহ মোটা জাতের ধানগুলো এখন পাকতে শুরু করেছে। হাইব্রিড, উচ্চ ফলনশীল এবং স্থানীয় এই তিন ধরনের ধানে এবার হেক্টরপ্রতি গড় ফলন এগ্রেছে ৩ দশমিক ১৪ টন। বগুড়ায় বরাবরের মতো শাজাহানপুরে বেশ আগেই ধান কাটা শুরু হয়েছে। গত বছর ধান কাটার মৌসুমে স্বর্ণা জাতের ধানের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৫৫০ টাকা মণ। এবার একই ধান ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে কেনাবেচা হচ্ছে। বিনা-৭ ও রণজিত জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৭২০ থেকে ৭৫০ টাকায়। এবার ১০ বিঘা জমিতে দিনাজপুরের বিখ্যাত কাটারিভোগ ধানের আবাদ হয়েছে বেশি। প্রতি বিঘায় গড়ে ২০ মণ করে ফলন পেয়েছি। প্রতিমণের দামও ৮৫০ টাকার উপরে। সামনের দিনে দাম আরও বাড়বে বলে আশা করছে ধানচাষীরা। এতে লাভের পরিমাণও বাড়বে। অনুকূল আবহাওয়া থাকায় রাজশাহীতেও এবার রোপা আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো ফলনের সঙ্গে এবার দামও মিলছে ভালো। রাজশাহীর অধিকাংশ চাষির ধান কাটা হয়ে গেছে। চাষিরা জমিতে রেখেই ধান শুকিয়ে নিচ্ছেন। এরপর তারা ধান মাড়াই করে ঘরে তুলছেন। এ কাজে চাষিদের সঙ্গে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার শ্রমিকরা। গত বছর ৫০০ টাকা মণ দরে ধান কেনার লোক ছিল না। এ বছর মোটা ধানও বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা মণ। সরু ধান ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। ৪৯ জাতের ধান ৯০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। ভালো দাম থাকায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। রোপা আমন চাষের মৌসুমটা খুবই অনুকূলে ছিল। কিছু দিন পরপর পরিমাণ মতো বৃষ্টি হয়েছে। তাই সেচের প্রয়োজন হয়নি। আকাশ মেঘলা ছিল না বলে রোগবালাই কম হয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে ২০ থেকে ২২ মণ হারে ধান হয়েছে। আমনের ভালো দামে খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়েছে কৃষক-কৃষাণির চোখে-মুখে। উৎসাহ আর উদ্দীপনায় চলছে কৃষকের কাস্তে। ধান কাটা উৎসব এখন গ্রামে-গ্রামে। গত কয়েক বছর লোকসান সোনার পর লাভের হিসাব কষছেন এবার কৃষকরা। মৌসুমের শুরুতেই হাটে চিকন জাতের ভেজা ধান বিক্রি হচ্ছে ১১শ’ টাকা মণ। এ দাম গত ৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। নতুন ধান উঠতে শুরু করায় দামের পারদ ঊর্ধ্বমুখী থাকা চালের বাজারও অনেকটাই স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। আমন রোপণের শুরুতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় ক্ষতিগস্ত হয় কৃষকের রোপা আমন বীজতলা। এরপর ধান পাকার ঠিক আগ মূহূর্তে অতিবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় মাটির সঙ্গে লেপ্টে যায় তাদের ঘাম ঝরানো ফসল। এর আগে আগাম বন্যায় হাওরের ফসলহানির দুঃখ ভুলতে পারেননি কৃষক। এবার বৈরী প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে ফুটেছে তাই অনাবিল হাসি। সারাদেশেই মৌসুমের শুরুতে ভেজা পাইজাম, দীঘা, আজলদীঘা, লাউল, কাশো ধান ১১শ’ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। গত বছর নতুন আমন ধান ৫শ’ থেকে ৭শ’ টাকা মণে বিক্রি হয়। পাট বেচেও লোকসানে পড়তে হয়নি কৃষককে। আর যারা সবজি চাষ করেছেন, তারা সবচেয়ে ভাগ্যবান। বৃষ্টির কারণে সবজির ভালো দাম মিলেছে। এবার কৃষি শ্রমিকদেরও পোয়াবারো। বাড়তি মজুরি দিয়েও কৃষি শ্রমিক মেলানো দায়। ধান কাটা ও মাড়ানোর মিছিলে যোগ দিয়েছেন নারী কৃষি শ্রমিকরাও। আমন ধানের কেনা-বেচাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙ্গা হয়েছে। দেশে উৎপাদিত ধানের প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে আমন থেকে। বাকি ৬৫ শতাংশ মেটায় বোরো ও আউশ। কৃষকের এ হাসিখুশি দ্রুতই উবে যাওয়ার আশঙ্কাও করছে কৃষক সংগঠনগুলো। ধান-চাল কেনার সরকারি সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা হলেই দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাই দাম পড়ে যাওয়ার আগেই ভেজা ও আধা-পাকা ধান বেচে দিচ্ছেন কৃষক। তারা আশঙ্কা করছেন, সরকার বাজার পর্যবেক্ষণ না করে ধান-চাল সংগ্রহের মূল্য কম ঘোষণা করলে ধানের দাম কমে যাবে। কৃষকরা বঞ্চিত হবেন ন্যায্যমূল্য থেকে।
গত ২৯ ও ৩০ মার্চ বৃষ্টি ঝড় শিলার কারণে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ করা গেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশি ধান পুরোদমে কাটা যাবে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। তবে উচ্চ ফলনশীল ধানের প্রতি ঝুঁকে যাওয়ার কারণে এখন দেশি ধানের আবাদ কমে আগ্রছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কৃষি বিভাগের মতে, সুনামগঞ্জের প্রায় গাড়ে ৩ লাখ চাষি পরিবার বোরো চাষের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। গতবার ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। যা স¤পূর্ণই তলিয়ে গিয়েছিল। এবছর দেশি প্রজাতির ধান ৪৯১২ হেক্টর, উফশী ১৮৩৫৫ হেক্টর এবং হাইব্রিড ৩২ হেক্টর চাষ হয়েছে। গতবছর ১ লাখ ৬২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হিসেবে সরকার গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০ টাকা প্রদান এখনো অব্যাহত রেখেছে। নতুন ফসল গোলায় ওঠা পর্যন্ত এই সহায়তা অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, হাওরে দেশি-প্রজাতির ধান অন্যান্য ধানের চেয়ে আগে পাকে। এ ধান চৈত্র মাসের দ্বিতীয়-তৃতীয় সপ্তাহেই পাকা শুরু হয়। আর সেটা কেটে দেশি ধানের স্বাদে বোরোর স্বাদ নেন কৃষক। এবারও বিভিন্ন এলাকায় কৃষক দেশি ধান কাটছেন। অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে জমি চাষ করেছে কৃষকরা। কৃষকের চোখেমুখে এখন হাসির ঝিলিক।
লেখক : কবি, সাংবাদিক


প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০১৮, ১০:০৪:৩৫ অপরাহ্ন



 
Advertise